কুষ্টিয়ায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সার ও বীজের বরাদ্দ, বিতরণ ও বাজারজাতকরণকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের কাছ থেকে বাড়তি দামে সার বিক্রি করছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। এর সঙ্গে স্থানীয় কিছু ডিলার ও বিএডিসির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আমন মৌসুমে সারের চাহিদা বাড়ার সময় নতুন করে সংকট দেখা দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কুষ্টিয়ার কৃষকরা। সরকারি দামে অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে অনেক কৃষককে খোলা বাজার থেকে অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হচ্ছে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে কৃত্রিম সংকটের চিত্র
২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট ডিবিসি নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে কুষ্টিয়ায় কৃত্রিম সারসংকট ও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি শক্তিশালী চক্র সংকট তৈরি করে সারের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেখানে বিএডিসি বীজ ও সার ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মনি জুয়াবেদ রিপন এবং বিসিআইসি সার ডিলার শফিকুল ইসলামের বক্তব্যও উঠে আসে। তারা সার বিতরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
ডিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এক জেলার বরাদ্দের সার অন্য জেলায় সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকলেও কুষ্টিয়ায় এ ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও গণমাধ্যমের কাছে বক্তব্য দিয়েছেন।
এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কুষ্টিয়ার বিএডিসির আঞ্চলিক সার গুদামে বিপুল পরিমাণ টিএসপি সার মজুত থাকার তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও বরাদ্দ ও বিতরণ নিয়ে জটিলতার কারণে বাজারে সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
ডিলারদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ
স্থানীয় পর্যায়ে কিছু ডিলারের বিরুদ্ধে বরাদ্দের সার যথাসময়ে কৃষকদের কাছে সরবরাহ না করে মজুত রাখা এবং পরে বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি দামে অনুমোদিত ডিলারের দোকানে সার পাওয়া না গেলেও একই সার খোলা বাজারের কিছু দোকানে বেশি দামে পাওয়া যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বণিক বার্তা জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা অনুমোদিত ডিলারের দোকানে প্রয়োজনীয় সার না পেলেও খুচরা বাজারে বেশি দামে তা কিনতে পারছেন। এতে সরকারি দামের সঙ্গে বাজারদরের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে এবং কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
কুষ্টিয়াতেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় কৃষক ও ডিলারদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএডিসির কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
সার বিতরণ ও বরাদ্দ ব্যবস্থাপনায় বিএডিসির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ডিলারদের একাংশের দাবি, কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছাড়া সরকারি বরাদ্দের সার নিয়মবহির্ভূতভাবে সরিয়ে নেওয়া বা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা কঠিন।
কুষ্টিয়া বিএডিসির সার কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অতীতেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালে স্থানীয় সার ডিলারদের পক্ষ থেকে বিএডিসির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ প্রশাসনের বিভিন্ন বৈঠকে উত্থাপনের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং সরকারি তদন্তের ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কোনো কর্মকর্তা বা ডিলারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তা অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর দাবি
সারের কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ শুধু কুষ্টিয়ায় নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকাতেও আলোচনায় এসেছে। ১২ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত বণিক বার্তার প্রতিবেদনে কৃষকদের সরকারি দামে চাহিদামতো সার না পাওয়া এবং খুচরা বাজারে বেশি দামে সার পাওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
এ অবস্থায় সার বিতরণ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি, ডিলারদের মজুতের হিসাব নিয়মিত যাচাই এবং সরকারি বরাদ্দের সার কোথায় যাচ্ছে—তার স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
কুষ্টিয়ার কৃষক ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কৃষকের কাছে সরকারি দামে সার পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত না হলে উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে। এর প্রভাব পড়তে পারে আমনসহ পরবর্তী মৌসুমের ফসল উৎপাদনেও। তাই সার নিয়ে কৃত্রিম সংকট ও বাজার কারসাজির অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।