শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এক পরিচিত দর্শন হলো “দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো”। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে তিনি দেশকে দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বড় সুযোগ পান। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁর আমলে দেশে নতুন করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেন, ড. ইউনূসের সময়ে দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রবাসী আয় ও রিজার্ভ বৃদ্ধি সত্ত্বেও অন্যান্য সূচক নিম্নমুখী ছিল। ব্যবসায়িক আস্থা কমে গেছে, শিল্প উৎপাদন কমেছে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়েনি এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। বেসরকারি খাতের গড় বিনিয়োগ ২০২৪ সালের জুনে জিডিপির ২৪% থেকে ২০২৫ সালের জুনে ২২.৪৮% তে নেমে আসে, যা গত চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ও তলানিতে: বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন ১১.৫%, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩৫.৭৩%, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। সরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ২৩ লাখ কোটি টাকার আশেপাশে পৌঁছেছে।
মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ৮.৫% থাকলেও মজুরি বৃদ্ধির হার ৮.১%-এর নিচে। অর্থাৎ মানুষের আয়ের তুলনায় খরচ বেশি হচ্ছে, ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি ও বেসরকারি খাতের ঋণ সংকুচিত হওয়ার কারণে ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতেও ড. ইউনূস রিজার্ভ বৃদ্ধিকে গৌরবের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্বে বসবাসরত গবেষক ড. লুবনা তুরীন মনে করেন, রিজার্ভ কোনো লক্ষ্য নয়, বরং এটি একটি উপকরণ। লক্ষ্য হওয়া উচিত উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, নীতিগত স্বাধীনতা। তার রিজার্ভ বৃদ্ধির নীতি সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, শিল্প খাতকে সংকুচিত করেছে এবং জীবিকা ব্যাহত করেছে।
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের ফাঁক
প্রথম ভাষণে ড. ইউনূস প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ছাড়া এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হয়নি।
তার আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দুদক তদন্ত করছে, এবং স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থ পাচারের মামলা দ্রুত খারিজ হওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও ‘তিন শূন্য’ প্রচারণা
ড. ইউনূস যখন আন্তর্জাতিকভাবে ‘তিন শূন্য’ (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন নিংসরণ) প্রচারণা চালাচ্ছেন, নিজের দায়িত্বে থেকেও সে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি। বরং তার সময়ে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে, শিল্প ও অর্থনীতির বেশিরভাগ সূচক সংকটে।