মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমর নাম জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি (এম.এ.জি) ওসমানী-এর মৃত্যুবার্ষিকী আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি)। ১৯৮৪ সালের এই দিনে ৬৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রতি বছর এই দিনে বাংলাদেশে তার অবদানের স্মরণে নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
জেনারেল ওসমানীর জন্ম ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে। তার গ্রামের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জে। শৈশবে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকেই। কোনো স্কুলে ভর্তি না হয়ে, ঘরে বসেই তিনি তার বিদুষী মায়ের তত্ত্বাবধানে বাংলা ও ফার্সি ভাষা শেখেন এবং যোগ্য গৃহশিক্ষকের সঙ্গে পড়াশোনা করেন। ১৯২৯ সালে ১১ বছর বয়সে তাকে আসামের গৌহাটির কটন স্কুলে ভর্তি করা হয়। কটন স্কুলে শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর মায়ের ইচ্ছায় ১৯৩২ সালে সিলেট সরকারি পাইলট স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৩৪ সালে তিনি মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করেন এবং ইংরেজিতে কৃতিত্বের জন্য ‘প্রিটোরিয়া অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন।
উচ্চ শিক্ষার জন্য ১৯৩৪ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন জেনারেল ওসমানী। তিনি ১৯৩৬ সালে আই.এ পাশ করেন এবং ১৯৩৮ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষা জীবনে তার ধারাবাহিক উৎকর্ষতা পরবর্তীতে তার সেনা ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৪৭ সালের ৭ অক্টোবর লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৪৮ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পি.এস.সি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান সেনা সদর অপারেশন পরিদপ্তরে জেনারেল স্টাফ অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৫৬ সালে কর্নেল পদে পদোন্নতি পেয়ে ডেপুটি ডাইরেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিয়াটো ও সেন্টো সংস্থায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিত্বও করেন।
১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি দক্ষতার সঙ্গে ডেপুটি ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনের দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্নেল পদে থাকা অবস্থায় তিনি একজন স্বাধীনচেতা বাঙালি অফিসার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৬৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কর্নেল পদে থাকা অবস্থায় তিনি অবসরে যান।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ-বিশ্বনাথ এলাকা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অবিস্মরণীয় নেতৃত্ব প্রদর্শন করেন। মুক্তিবাহিনীর প্রধান হিসেবে তার অবদান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অমর অধ্যায়।
মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি দেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক নানা কাজে অবদান রাখেন। ৬৫ বছর বয়সে ১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয় সিলেটে হযরত শাহজালাল (রঃ) মাজার সংলগ্ন এলাকায়, যেখানে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হন।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী শুধু একজন সেনাপতি নয়, তিনি ছিলেন সাহসী, দূরদর্শী ও দেশপ্রেমিক নেতা, যিনি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তার জীবন ও কীর্তি আজও প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।