প্রথমবারের মতো ৪৮ দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই আসরে দলগুলোকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল সরাসরি রাউন্ড অব ৩২-এ জায়গা করে নেবে। এছাড়া সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দলও নকআউট পর্বে খেলার সুযোগ পাবে।
গ্রুপ পর্বের ড্র অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই কয়েকটি গ্রুপকে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং কয়েকটিকে তুলনামূলক সহজ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গ্রুপ ‘I’: ফ্রান্স, সেনেগাল, ইরাক, নরওয়ে
এই গ্রুপটিকেই অনেকের মতে এবারের ‘গ্রুপ অব ডেথ’ বলা যায়। কারণ চার দলের সম্মিলিত গড় ফিফা র্যাংকিং সবচেয়ে শক্তিশালী।
দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামবে। আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল সেনেগালও যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। আর্লিং হালান্ডের নেতৃত্বে নরওয়েকে টুর্নামেন্টের সম্ভাব্য ‘ডার্ক হর্স’ ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘ ও কঠিন বাছাইপর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে ইরাক।
সরাসরি কোয়ালিফাইয়ের ফেভারিট: ফ্রান্স ও সেনেগাল।
গ্রুপ ‘F’: নেদারল্যান্ডস, জাপান, সুইডেন, তিউনিসিয়া
ভারসাম্যপূর্ণ এই গ্রুপে এগিয়ে রয়েছে নেদারল্যান্ডস। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা জাপান ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে। সুইডেনের আক্রমণভাগে আছেন আলেকজান্ডার ইসাক ও ভিক্টর গিওকেরেসের মতো তারকা। অন্যদিকে বাছাইপর্বে একটি গোলও না খেয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে তিউনিসিয়া।
সরাসরি কোয়ালিফাইয়ের ফেভারিট: নেদারল্যান্ডস ও জাপান।
গ্রুপ ‘L’: ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, ঘানা, পানামা
শেষ দুই বিশ্বকাপে ফাইনাল ও সেমিফাইনালে খেলা ক্রোয়েশিয়া আবারও বড় কিছু করার লক্ষ্য নিয়ে আসরে নামছে। তবে দলীয় শক্তি ও গভীরতার বিচারে ইংল্যান্ডকে গ্রুপের প্রধান দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরাসরি কোয়ালিফাইয়ের ফেভারিট: ইংল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়া।
গ্রুপ ‘C’: ব্রাজিল, মরক্কো, হাইতি, স্কটল্যান্ড
এই গ্রুপে রয়েছে ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দশের দুটি দল।
কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল হয়তো আগের মতো অপ্রতিরোধ্য নয়, তবে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৌড়ে তারাই এগিয়ে। আফ্রিকান কাপ অব নেশনস চ্যাম্পিয়ন মরক্কো ২০২২ বিশ্বকাপের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাইবে। স্কটল্যান্ড ও হাইতি মূলত তৃতীয় স্থানের জন্য লড়বে, তবে চমক দেখানোর সামর্থ্য তাদের রয়েছে।
সরাসরি কোয়ালিফাইয়ের ফেভারিট: ব্রাজিল ও মরক্কো।
গ্রুপ ‘K’: পর্তুগাল, ডিআর কঙ্গো, উজবেকিস্তান, কলম্বিয়া
কাগজে-কলমে গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দল পর্তুগাল ও কলম্বিয়া। ২০২৪ কোপা আমেরিকার ফাইনালিস্ট কলম্বিয়া গ্রুপ সেরার লড়াইয়ে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।
তবে প্লে-অফ পেরিয়ে আসা উজবেকিস্তান কিংবা ডিআর কঙ্গোকেও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সরাসরি কোয়ালিফাইয়ের ফেভারিট: পর্তুগাল ও কলম্বিয়া।
গ্রুপ ‘H’: স্পেন, কেপ ভার্দে, সৌদি আরব, উরুগুয়ে
স্পেন ও উরুগুয়েকে এই গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে সৌদি আরব ও কেপ ভার্দেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমিয়ে তুলতে পারে।
সরাসরি কোয়ালিফাইয়ের ফেভারিট: স্পেন ও উরুগুয়ে।
গ্রুপ ‘E’: জার্মানি, কুরাসাও, আইভরি কোস্ট, ইকুয়েডর
জার্মানি গ্রুপের প্রধান দাবিদার হলেও আফ্রিকান শক্তি আইভরি কোস্ট ও দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডরও কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে।
সরাসরি কোয়ালিফাইয়ের ফেভারিট: জার্মানি ও ইকুয়েডর।
গ্রুপ ‘J’: আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, জর্ডান
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা স্বাভাবিকভাবেই গ্রুপের শীর্ষ দাবিদার। দ্বিতীয় স্থানের জন্য অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার মধ্যে লড়াই হতে পারে।
সরাসরি কোয়ালিফাইয়ের ফেভারিট: আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়া।
গ্রুপ ‘A’: মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র
গড় র্যাংকিং তুলনামূলক কম হওয়ায় এটিকে সহজ গ্রুপগুলোর একটি ধরা হচ্ছে। মেক্সিকো ও দক্ষিণ কোরিয়া এগিয়ে থাকলেও অন্য দলগুলোকেও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সরাসরি কোয়ালিফাইয়ের ফেভারিট: মেক্সিকো ও দক্ষিণ কোরিয়া।
গ্রুপ ‘G’: বেলজিয়াম, মিশর, ইরান, নিউজিল্যান্ড
বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের যুগ শেষ হলেও এই গ্রুপ তাদের জন্য তুলনামূলক সহজ বলে মনে করা হচ্ছে। মিশরও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত।
সরাসরি কোয়ালিফাইয়ের ফেভারিট: বেলজিয়াম ও মিশর।
গ্রুপ ‘D’: যুক্তরাষ্ট্র, প্যারাগুয়ে, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া
সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রুপটি বেশ সুবিধাজনক। তবে প্যারাগুয়ে, তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও জমজমাট হতে পারে।
সরাসরি কোয়ালিফাইয়ের ফেভারিট: যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক।
গ্রুপ ‘B’: কানাডা, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, কাতার, সুইজারল্যান্ড
গড় ফিফা র্যাংকিংয়ের বিচারে এটিকে তুলনামূলক দুর্বল গ্রুপ বলা হচ্ছে। তবে চার দলের শক্তির পার্থক্য খুব বেশি নয়, ফলে লড়াই হতে পারে সমানে সমান।
সরাসরি কোয়ালিফাইয়ের ফেভারিট: সুইজারল্যান্ড ও কানাডা।
সংক্ষেপে
৪৮ দলের নতুন বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই দেখা যেতে পারে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিশেষ করে ফ্রান্স, সেনেগাল, নরওয়ে ও ইরাককে নিয়ে গঠিত গ্রুপ ‘I’ সবচেয়ে কঠিন গ্রুপ হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। অন্যদিকে গ্রুপ ‘A’ ও ‘B’ তুলনামূলক সহজ হলেও সেখানে চমকের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য হতে যাচ্ছে এক রোমাঞ্চকর লড়াই।